দান - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দান



       কাঁকন-জোড়া এনে দিলেম যবে,
         ভেবেছিলেম, হয়তো খুশি হবে।
তুলে তুমি নিলে হাতের 'পরে,
ঘুরিয়ে তুমি দেখলে ক্ষণেক-তরে,
পরেছিলে হয়তো গিয়ে ঘরে -
         হয়তো বা তা রেখেছিলে খুলে।
এলে যেদিন বিদায় নেবার রাতে
কাঁকনদুটি দেখি নাই তো হাতে,
                  হয়তো এলে ভুলে।।

         দেয় যে জনা কী দশা পায় তাকে,
         দেওয়ার কথা কেনই মনে রাখে!
পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে
শাখা আবার চায় কি তাহার পানে।
বাতাসেতে-উড়িয়ে-দেওয়া গানে
         তারে কি আর স্মরণ করে পাখি?
দিতে যারা জানে এ সংসারে
এমন ক'রেই তারা দিতে পারে
                  কিছু না রয় বাকি।।

         নিতে যারা জানে তারাই জানে,
         বোঝে তারা মূল্যটি কোনখানে।
তারাই জানে, বুকের রত্নহারে
সেই মণিটি কজন দিতে পারে
হৃদয় দিতে দেখিতে হয় যারে -
         যে পায় তারে সে পায় অবহেলে।
পাওয়ার মতন পাওয়া যারে কহে
সহজ ব'লেই সহজ তাহা নহে,
                  দৈবে তারে মেলে।।

         ভাবি যখন ভেবে না পাই তবে
         দেবার মতো কী আছে এই ভবে।
কোন্ খনিতে কোন্ ধনভান্ডারে,
সাগর-তলে কিম্বা সাগর-পারে,
যক্ষরাজের লক্ষমণির হারে
         যা আছে তা কিছুই তো নয় প্রিয়ে!
তাই তো বলি যা-কিছু মোর দান
গ্রহণ করেই করবে মূল্যবান
                  আপন হৃদয় দিয়ে।।



আন্ডেস জাহাজ
৩ নভেম্বর ১৯২৪ (১৭ কার্তিক ১৩৩১)

(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)